জ্বালানি তেলের সরবরাহসংকট ও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে গাজীপুরের শিল্প খাতগুলোতে। একদিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি, অন্যদিকে জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এদিকে জ্বালানিসংকটের কারণে গাজীপুরের হাজার হাজার ডাইং ওয়াশিং কারখানা বন্ধের পথে রয়েছে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন শিল্পমালিক ও শ্রমিকরা।
শনিবার (৪ এপ্রিল) গাজীপুরের শিল্প এলাকা টঙ্গী, বোর্ড বাজার, গাজীপুরা সাতাইশ, সালনা, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, কালিয়াকৈর, শ্রীপুর ও কাপাসিয়ায় গিয়ে পোশাক কারখানার সংশ্লিষ্ট অন্তত ২০ ব্যক্তির সঙ্গে কথা হয়।
তারা জানান, ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের সরবরাহে অনিয়ম ও মূল্যবৃদ্ধি এবং কাঁচামাল সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নের কারণে অনেক কারখানায় উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে গার্মেন্টস, ডাইং ওয়াশিং কারখানা, টেক্সটাইল ও প্লাস্টিক শিল্পে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে। এদিকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় বিকল্প হিসেবে জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা পুরোপুরি জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভর। এদিকে তেল-গ্যাসসংকটের কারণে কারখানা কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহার করার পরিবহন বন্ধ করে দিয়েছেন।
গাজীপুরের একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকরা জানান, জ্বালানিসংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে তারা উৎপাদন কমিয়ে আনতে বাধ্য হবেন। এতে রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়নে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গাজীপুরে শ্রমিকনেতারাও এ পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, উৎপাদন কমে গেলে শ্রমিক ছাঁটাই বা বেতন বকেয়া পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা সামাজিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন শ্রমিকরা।
জেনারেটর জ্বালানি পাচ্ছেন না পোশাকমালিকরা
লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে কারখানা সচল রাখতে হয় রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের। কিন্তু কয়েক দিন ধরে জ্বালানি তেলের অভাবে শিল্পমালিকরা জেনারেটর চালাতে পারছেন না। এতে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন।
বর্তমান জ্বালানি তেলের সংকট পোশাকশিল্পকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। অনেক কারখানার মালিকরা জানান, তারা প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল যথাসময়ে পাচ্ছেন না। জ্বালানি তেল শুধু কারখানার ভেতরের উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি পুরো সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। জ্বালানি তেল না থাকলে কারখানা থেকে গুদাম, গুদাম থেকে বন্দর–এই পুরো পরিবহন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
ডাইং ওয়াশিং কারখানা বন্ধের পথে
ডাইং ওয়াশিংয়ের মাধ্যামে পোশাক কারখানার উৎপাদনের কাঁচামাল ব্যবহারের যোগ্য করার জন্য গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দরকার হয়। তবে গত কয়েক দিনে গ্যাস ও জ্বালানি তেলের সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। কয়েকজন মালিক জানান, এর ফলে গাজীপুরের হাজার হাজার ডাইং ওয়াশিং কারখানা বন্ধের পথে রয়েছে।
টঙ্গীর শিলমুন এআর ডাইং ওয়াশিং কারখানার মালিক আতাউর রহমান জানান, পোশাক তৈরির সময় পদ্ধতিগত কিছু কারণে অনেক সময় পোশাকের ত্বক কর্কশ হয়ে ওঠে। আর সেসব পোশাক পরলে চামড়ায় ফোসকা পড়ার সম্ভবনা থাকে। এই সমস্যা দূর করতে এবং তৈরি পোশাককে আরও মসৃণ করতে ওয়াশ করার প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া তৈরির পর কাঙ্ক্ষিত পোশাকটি নির্ধারিত মাপের তুলনায় কিছু ছোট বা বড় হতে পারে, আবার পোশাকের বিভিন্ন অংশ সংকুচিত অবস্থায় থেকে যেতে পারে। যেসব মেশিনে এসব সমস্যা সমাধান করতে হয়, সেগুলো চালাতে গ্যাস ও জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হয়। গত দুই দিন ধরে কয়েকটি ডাইং ওয়াশিং কারখানা বন্ধ রয়েছে। ডাইং ওয়াশিং কারখানা বন্ধ হলে পোশাক কারখানাও অটোমেটিক বন্ধ হয়ে যাবে।
রয়েল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রায়হান আহমেদ হৃদয় বলেন, ‘জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে কবে নাগাদ পরিস্থিতির উন্নতি হবে, তা স্পষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা না গেলে দেশের শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ সমস্যার টেকসই সমাধানে বিকল্প জ্বালানিব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব না দিলে আমাদের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে।’
গাজীপুরের স্টাইলিশ কারখানার চেয়ারম্যান ও ইবিএফসিআইয়ের পরিচালক সালাউদ্দিন চৌধুরী বলেন, গাজীপুরে অধিকাংশ কারখানায় জ্বালানি তেল পাচ্ছে না। কারখানার ব্যবহারের জন্য গাড়ির মজুত তেল প্রায় শেষের দিকে। দু-এক দিনের মধ্যে তেল না পেলে পণ্য সরবরাহব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এ ছাড়া কয়েক দিন ধরে পাম্প থেকে ডিজেল কিনতে পারছে না কারখানাগুলো। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে উৎপাদন ব্যাহত হবে। ঈদের আগে পাম্প থেকে জ্বালানি তেল পেতে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সদস্য প্রতিষ্ঠানকে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। তবে সেটি এখন কাজ করছে না। এদিকে শনিবার সদস্য কারখানাগুলোকে তাদের জেনারেটরের ক্ষমতা এবং দিনে চার ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে কত লিটার তেল লাগবে, তার একটি চাহিদাপত্র চেয়েছে বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ।
গাজীপুর শিল্প-পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুর জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে বর্তমানে ২ হাজার ১৭৬টি নিবন্ধিত শিল্প কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক কারখানার সংখ্যা ১ হাজার ১৫৪টি।