নীলফামারী প্রতিনিধি:
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার দক্ষিণ সুন্দরখাতা পারঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোহসীন আলমকে ব্যতিক্রমী ও রাজকীয় আয়োজনে বিদায় জানানো হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় তিন দশকের কর্মজীবন শেষে সোমবার (৪ মে) তিনি অবসরে যান। তাঁর বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখতে সাবেক শিক্ষার্থীরা আয়োজন করে এক অনন্য সংবর্ধনার, যা এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জানা যায়, মো. মোহসীন আলম তাঁর কর্মজীবনে পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়ন, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর নেতৃত্বে বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ও ফলাফল উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়।
সকাল থেকেই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। সাধারণত বিয়ের অনুষ্ঠানে ঘোড়ার গাড়ি ও বাজনা পার্টির প্রচলন থাকলেও, একজন শিক্ষকের বিদায়ে এমন আয়োজন এলাকায় ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। প্রিয় শিক্ষককে সম্মান জানাতে সাবেক শিক্ষার্থীরা সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়ি ও পেশাদার বাজনা দলের ব্যবস্থা করেন।
বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, অভিভাবক, বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় সাবেক শিক্ষার্থীরা আবেগঘন স্মৃতিচারণ করে বলেন, “স্যার শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের জীবন গড়ার কারিগর। তাঁর শেখানো শৃঙ্খলা, সততা ও মানবিক মূল্যবোধ আমাদের প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে।”
অনুষ্ঠান শেষে সাবেক শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে তাঁকে সম্মাননা স্মারক, মানপত্র, ক্রেস্ট ও বিভিন্ন উপহার প্রদান করা হয়।
বিদায়ের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি আসে অনুষ্ঠানের শেষপর্বে। বাদ্যযন্ত্রের সুর ও পুষ্পবৃষ্টির মধ্য দিয়ে প্রিয় শিক্ষক মোহসীন আলমকে ঘোড়ার গাড়িতে তোলা হয়। এরপর একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে পুরো গ্রাম প্রদক্ষিণ করে তাঁকে তাঁর নিজ বাসভবনে পৌঁছে দেওয়া হয়। এ সময় রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে শত শত মানুষ ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা হাত নেড়ে তাঁকে বিদায় জানান। অনেকেই এই দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করেন, যা পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
শিক্ষার্থীদের এমন অকৃত্রিম ভালোবাসায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বিদায়ী প্রধান শিক্ষক মো. মোহসীন আলম। তিনি বলেন, “শিক্ষক হিসেবে এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আমার ছাত্ররা আমাকে যে সম্মান দেখিয়েছে, তা আমি কখনো ভুলব না। আমি তাদের সবার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।”
ডিমলা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বীরেন্দ্রনাথ রায় বলেন, “মো. মোহসীন আলম একজন নিবেদিতপ্রাণ ও আদর্শ শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাঁর কর্মনিষ্ঠা, সততা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিকতা সত্যিই অনুসরণযোগ্য। আজকের এই সম্মানজনক বিদায় আয়োজন প্রমাণ করে, তিনি শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে কতটা গভীরভাবে স্থান করে নিয়েছেন। একজন শিক্ষকের জন্য এর চেয়ে বড় অর্জন আর কিছু হতে পারে না। আমি তাঁর সুস্বাস্থ্য, সুখ ও শান্তিময় অবসর জীবন কামনা করছি।”
বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষক ও অভিভাবকরা বলেন, একজন শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীদের এমন সম্মান বর্তমান সমাজে বিরল দৃষ্টান্ত। এটি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর গভীর ও মানবিক সম্পর্কেরই প্রতিফলন।
বর্তমান সময়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক যখন নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন ডিমলার এই আয়োজন সমাজের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। প্রিয় শিক্ষকের প্রতি এমন রাজকীয় সম্মান ও ভালোবাসা নিঃসন্দেহে গুরু-ভক্তির এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবে।